আবিরুজ্জামান , ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, ঢাকা : রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য সাধারণত যানবাহন, শিল্পকারখানা ও নির্মাণকাজকে দায়ী করা হয়। তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত সাভার, ধামরাই ও কালিয়াকৈরের শতাধিক ইটভাটাও রাজধানীর দূষণের একটি বড় উৎস হিসেবে কাজ করছে। ঢাকার নির্মাণ খাতের বিশাল চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে এসব ভাটা বছরের পর বছর বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া ও ক্ষতিকর বস্তুকণা বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে। 

ঢাকার পাশের উপজেলা সাভার ও ধামরাই, এবং গাজীপুরের কালিয়াকৈর দীর্ঘদিন ধরে ইট উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। রাজধানীর নিকটবর্তী হওয়ায় এসব এলাকায় শতাধিক ইটভাটা গড়ে উঠেছে, যা ঢাকার নির্মাণ খাতের প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করছে।

ইটভাটা মালিক, নির্মাণ খাতের উদ্যোক্তা, পরিবহন ব্যবসায়ী এবং রাজধানীর নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন পক্ষ এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। অন্যদিকে স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দারা দূষণের প্রভাবের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন।

পরিবেশবিদদের মতে, ইটভাটাগুলো থেকে নির্গত ধোঁয়া, কার্বন এবং সূক্ষ্ম বস্তুকণা (PM2.5 ও PM10) বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে ঢাকার বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করছে। ফলে রাজধানীর বায়ুদূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুম ও শীতকালে এ দূষণ আরও তীব্র আকার ধারণ করে।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঢাকার কাছাকাছি হওয়ায় এসব এলাকা থেকে রাজধানীতে ইট পরিবহনের খরচ তুলনামূলক কম। এতে জ্বালানি ও সময় উভয়ই সাশ্রয় হয়। বিপরীতে দূরবর্তী জেলা থেকে ইট আনতে খরচ অনেক বেশি হওয়ায় সাভার, ধামরাই ও কালিয়াকৈর ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।

এই অর্থনৈতিক সুবিধার কারণে গত দুই দশকে এসব অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে ইটভাটার সংখ্যা বেড়েছে। কৃষিজমি, খোলা মাঠ ও নদীসংলগ্ন এলাকায় একের পর এক ভাটা স্থাপন করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকাল ও শুষ্ক মৌসুমে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময় বাতাসে ধোঁয়া ও ক্ষতিকর কণার ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়, যা সহজেই রাজধানীর দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

পরিবেশবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম কণা বাতাসের প্রবাহের মাধ্যমে রাজধানীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। ফলে ঢাকার দূষণ শুধু শহরের অভ্যন্তরীণ উৎসের কারণে নয়, আশপাশের শিল্পাঞ্চল ও ইটভাটা অঞ্চল থেকেও বৃদ্ধি পায়।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ইটভাটার ছাই ও ধোঁয়ার কারণে কৃষিজমির উর্বরতা কমছে এবং ফসলের ফলন হ্রাস পাচ্ছে। পাশাপাশি অনেক বাসিন্দা শ্বাসকষ্ট, কাশি ও চোখে জ্বালাপোড়াসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যার কথা জানিয়েছেন।

সাভারের এক কৃষক বলেন, “শীতের সময় মাঠে ধোঁয়া আর ছাই এত বেশি থাকে যে ফসলের পাতার ওপর আস্তরণ পড়ে যায়। আগের মতো ফলন পাই না।”

আইন অনুযায়ী প্রতিটি ইটভাটাকে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে পরিবেশগত ছাড়পত্র (ইসিসি) নিতে হয়। ছাড়পত্র প্রদানের সময় ভাটার অবস্থান, প্রযুক্তি, নির্গমনমাত্রা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনা করার কথা থাকলেও বাস্তবে এসব শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ ও তদারকি করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অনেক ক্ষেত্রে ছাড়পত্রের সময় প্রদত্ত তথ্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল পাওয়া যায় না। কোথাও কৃষিজমির পাশে ভাটা পরিচালিত হচ্ছে, আবার কোথাও পুরোনো ও অধিক দূষণকারী প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবুও বছরের পর বছর এসব ভাটার ছাড়পত্র নবায়ন করা হচ্ছে।

ঢাকার নির্মাণ খাত সচল রাখতে ইটভাটাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে রাজধানীর উন্নয়নের জন্য ব্যবহৃত এই ইটের পরিবেশগত মূল্যও কম নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ঢাকার উন্নয়নের জন্য সৃষ্ট এই দূষণের পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত খরচ কে বহন করবে এবং সেই হিসাব কবে বাস্তবভাবে মূল্যায়ন করা হবে?