বংশী ও ধলেশ্বরী একসময় ছিল চাষ আর মাছ ধরার ভরসা; এখন শিল্পবর্জ্যে ভারী ধাতু আর রাসায়নিকের বোঝা বইছে। পাশাপাশি দ্রুত নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। প্রশ্নটা তাই শুধু নদীর নয়—খাদ্য, পানি আর জীবিকার

সাভারের বংশী ও ধলেশ্বরী নদী একসময় ছিল আশপাশের কৃষক আর জেলেদের জীবনরেখা। আজ সেই দুই নদীই বইছে ভারী ধাতু আর শিল্পবর্জ্যের বোঝা। সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণা বলছে, এ পানিতে ক্রোমিয়াম, সিসা, ক্যাডমিয়াম, আয়রনসহ নানা ধাতুর উপস্থিতি অনেক জায়গায় সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়েছে। আর সেই দূষণ এখন কেবল নদীতে আটকে নেই—পৌঁছে যাচ্ছে খেতের ফসল আর মানুষের পাতেও।

দূষণের সবচেয়ে ভালোভাবে নথিভুক্ত উৎস সাভারের ট্যানারি শিল্পনগর। বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারে সরানো হয়েছিল; কিন্তু গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, তাতে দূষণ দূর হয়নি—স্রেফ ঠিকানা বদলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০২৫ সালের একটি গবেষণা (Journal of Bangladesh Academy of Sciences-এ প্রকাশিত) ধলেশ্বরীর পানিতে ভারী ধাতু ও জীবাণু-দূষণের উদ্বেগজনক উপস্থিতি পেয়েছে। গবেষণা ও পরিবেশকর্মীদের হিসাব বলছে, সাভার ট্যানারি শিল্পনগর থেকে প্রতিদিন আনুমানিক ১২ থেকে ১৫ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি ধলেশ্বরীতে পড়ছে। কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) প্রায়ই বিকল থাকে, আর সেখানে ক্রোম রিকভারি ইউনিট না থাকায় বিষাক্ত ক্রোমিয়াম যৌগ সরাসরি নদীতে মিশছে বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।

ফলাফল উদ্বেগজনক। একটি গবেষণায় সাভার এলাকার মাটিতে ক্রোমিয়ামের পরিমাণ শুষ্ক মৌসুমে প্রতি কেজিতে ৯ হাজার মিলিগ্রাম পর্যন্ত পাওয়া গেছে, যা স্বাভাবিকের বহু গুণ। ২০০৫ থেকে ২০২৪ সালের তথ্য পর্যালোচনা করে প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক রিভিউ বলছে, বুড়িগঙ্গা–ধলেশ্বরী অববাহিকায় ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, সিসা, নিকেল, দস্তা, পারদ, আর্সেনিক, ম্যাঙ্গানিজ, তামা ও আয়রনের মতো ধাতু—এমনকি মাইক্রোপ্লাস্টিকও—পাওয়া যাচ্ছে; এর মধ্যে ক্রোমিয়াম প্রায়ই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশের নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

বংশীর অবস্থাও সংকটাপন্ন। দীর্ঘদিনের শিল্পবর্জ্যে নদীটির পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন প্রায় তলানিতে—যা জলজ প্রাণের জন্য মারাত্মক। বিশেষজ্ঞরা বহু আগেই সতর্ক করেছেন, ঢাকার চারপাশের যে নদীগুলো কার্যত “জৈবিকভাবে মৃত” বলে চিহ্নিত, বংশী তার একটি। অথচ এই বংশী থেকেই উৎপন্ন তুরাগ; আর সাভারের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ডিইপিজেড)-সংলগ্ন এই জলধারাগুলোতেই মেশে রং-ধোলাই কারখানার রঙিন, রাসায়নিক-ভরা বর্জ্য।

ফুরাচ্ছে ভরসার মিঠাপানিও

দূষণের পাশাপাশি ঘনাচ্ছে আরেকটি নীরব সংকট—মিঠাপানির ক্রমাগত হ্রাস। কাপড় রং-ধোলাই ও শিল্প-প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি তুলে নেওয়া হয়। বিশ্বব্যাংক-সমর্থিত একটি কর্মসূচির হিসাব বলছে, ঢাকা ও আশপাশের রং-ধোলাইকারখানাগুলো বছরে আনুমানিক ১ হাজার ৫০০ বিলিয়ন লিটার ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পানির স্তরে—গবেষণা বলছে, গত পাঁচ দশকে রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে ২০০ ফুটেরও বেশি। সাভারের মতো শিল্প-ঘন এলাকায় এই টান সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভূত হয়।

বিষয়টি উদ্বেগজনক। একদিকে নদী-জলাশয়ের পানি দূষণে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে ভরসার ভূগর্ভস্থ পানিও দ্রুত নামছে—দুইয়ে মিলে তৈরি হচ্ছে এক দ্বিমুখী সংকট, যেখানে ব্যবহারযোগ্য মিঠাপানির উৎস ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এই ধারা চলতে থাকলে আগামী বছরগুলোতে কেবল কৃষি ও মৎস্য নয়, ঘরের খাওয়ার পানি আর শিল্পের কাঁচামাল হিসেবেও পানি পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে—আর তা সরাসরি আঘাত হানবে এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও জনজীবনে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি খাদ্য নিরাপত্তার। দূষিত নদী-খাল-নালার পানিই অনেক জায়গায় সেচের কাজে ব্যবহৃত হয়। গবেষণা বলছে, সাভার, ধামরাই ও টঙ্গীর আশপাশ থেকে সংগৃহীত শাকসবজি ও ফলের নমুনায় আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, তামা, সিসা, পারদ, নিকেল ও দস্তার মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি মিলেছে। অর্থাৎ নদীর বিষ ঘুরেফিরে ফিরে আসছে মানুষের খাবারের থালায়। সঙ্গে যোগ হয়েছে মাছের আকাল—একসময় যে নদীতে নানা প্রজাতির মাছ মিলত, সেখানে স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, এখন আর তেমন মাছ নেই।

বংশী-তীরের একজন কৃষকের সাথে কথা বলে জানা গিয়েছে, ফ্যাক্টোরির রঙীন (রাসায়নিক দূষণের রঙ) যেই জমিতে যায় সেই জমিতে আর কোনো ফসল হয় না, নদীতে আগে প্রচুর দেশী মাছ পাওয়া গেলেও এখন জাল ফেললেই ধরা পড়ে ঝাকে ঝাকে সাকার মাছ

বিষয়টিকে কোনো নির্দিষ্ট কারখানার বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না; প্রশ্নটি মূলত ব্যবস্থার। কাগজে-কলমে এই ব্যবস্থাটি প্রায় নিখুঁত—আইন অনুযায়ী প্রতিটি শিল্পে কার্যকর বর্জ্য পরিশোধনাগার বাধ্যতামূলক, পারমিট ও পরিবেশগত ছাড়পত্র যথাযথ, নথিতে সম্মতি যেন ১০-এ ১০। কিন্তু কাগজের এই সম্মতি যদি বাস্তবেও সত্য হতো, তবে নদীতে এই মাত্রার ভারী ধাতু মিশত না, মাটিতে ক্রোমিয়াম জমত না, নদী থেকে মাছ উধাও হতো না, খেতের ফসলে বিষ ঢুকত না। নথি আর বাস্তবের এই ফারাকই আসল প্রশ্ন তুলে দেয়—সম্মতি কি কেবল কাগজে, নাকি মাঠেও সত্য? কে নিয়মিত যাচাই করছে, কীভাবে যাচাই হচ্ছে, আর সেই তথ্য জনসমক্ষে কতটা স্বচ্ছ?

নথিতে সম্মতি দেখানো হলেও মাঠের দূষণ-চিত্র এত ভিন্ন কেন; সিইটিপি বাস্তবে কতটা চালু থাকে; পরিশোধন ও পানি-উত্তোলন কীভাবে যাচাই পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

বিষয়টি নিছক পরিবেশের নয়। ভূউপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানি যখন একসঙ্গে বিষাক্ত ও সংকুচিত হয়, তখন ঝুঁকিতে পড়ে কৃষি, মৎস্য ও জনস্বাস্থ্য—অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। যে শিল্প দেশের রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের বড় অংশ ধরে রেখেছে, সেই শিল্পকেও দীর্ঘমেয়াদে টিকতে হলে দরকার পরিষ্কার ও পর্যাপ্ত পানি এবং স্বচ্ছ পরিবেশ-যাচাই। নদী ও ভূগর্ভস্থ পানি বাঁচানো তাই কেবল প্রকৃতি রক্ষা নয়—মানুষের পাত, খাওয়ার পানি আর জীবিকা বাঁচানোরও প্রশ্ন।

লেখক : স্বাধীন সাংবাদিক, পরিবেশ ও জলবায়ু