এপ্রিল 17, 2021

‘বন্ধু’ শব্দটির সাথে জড়িয়ে আছে আবেগ, ভালোবাসা, ভরসা

0 0
Read Time:11 Minute, 30 Second

বন্ধু আমাদের জীবনের অপরিহার্য একটা অংশ। এরা আমাদের মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে সাহায্য করে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। বন্ধুর কারণে আমরা বেঁচে থাকার আশা পাই। এরা আমাদের স্নায়বিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করে; অবশ্যই ইতিবাচক অর্থে! এই স্নায়বিক উত্তেজনার ঘাটতি হলেই বরং আমাদের বেশ ক্ষতি হয়ে যাবে। বন্ধু আমাদেরকে আমাদের মতো করে গ্রহণ করে। বন্ধুত্ব এমন একটা সম্পর্ক, যেখানে আমাদের নিজেকে লুকোনোর প্রয়োজন হয় না। আমরা নির্দ্বিধায় নিজেকে প্রকাশ করতে পারি। আমাদের ভালো দিক, খারাপ দিক, দোষ-গুণ, আবেগ-আহ্লাদ সবটা জেনেই বন্ধু আমাদের গ্রহণ করেন এবং কখনও অভিযোগ করে না। ছোট-বড় ভুল ভ্রান্তির জন্য তাদের সামনে লজ্জিত হতে হয় না।

বন্ধুর কাছ থেকে আমরা সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটা পাই তা হচ্ছে, বিশ্বাস করার শিক্ষা। বন্ধু আমাদের শেখায় বিশ্বাস করতে। বন্ধুর কাছে মন খুলে গল্প করা যায়। মনের সকল গোপন কথা নিঃসঙ্কোচে আমরা তাদেরকে বলে দিতে পারি। গোপন কথাগুলো গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি নিতে হয় না হাজারবার। এক অজানা বিশ্বাস ও ভরসা কাজ করে বন্ধুর উপর সকলেরই। আমরা জানি, বন্ধু আমাদের অসম্মান করবে না; অন্যদের মতো প্রতারণাও করবে না। জীবন মানেই সুখ-দুঃখের মিল মিশ। তাই প্রতিদিন ভালো কাটবে অথবা প্রতিটা সময় খারাপ যাবে, এমনটা আশা করা বড্ড ভুল। কিন্তু ভালো সময় আনন্দ না বাড়ালে আর খারাপ সময়ে দুঃখের বোঝা না কমালে কি এই ‘বন্ধুর’ পথ চলা সহজ হতো? মোটেই না। তাই আনন্দ ও কষ্ট দুটো মুহূর্তেই আমাদের খুব করে প্রয়োজন হয় বন্ধুদের। বন্ধু কাছে না থাকলেও ফোনের এপাশ থেকে নিজের কণ্ঠটা শুনিয়ে শান্ত করা যায় মন। বন্ধু না থাকলে আমরা হারিয়ে যেতাম কোনো এক হতাশার জগতে। জীবনে থাকত না কোনো আনন্দ-উদ্বেগ। বর্তমানে আমরা অনেকটা যান্ত্রিক জীবনযাপন করে থাকি। সবসময় আবেগগুলো চেপে রাখতে রাখতে আমাদের মধ্যে আবেগ প্রায় হারিয়েই যেতে বসেছে। কিন্তু বন্ধুর কল্যাণে আমাদের মধ্যে এখনও মানুষসত্ত্বা বেঁচে আছে। বন্ধুই একমাত্র মানুষ, যার সামনে মন খারাপ হলেই আমরা নির্দ্বিধায় ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে ফেলতে পারি। কারণ আমরা জানি, বন্ধু আমাদের কষ্ট দেখে আনন্দ পাবে না বা বিরক্ত হবে না। তারা অদমিত আবেগ দেখে ভ্রূ কুঁচকাবে না। বরং আমার কষ্ট বুঝবে; সেটা কমানোর চেষ্টা করবে। সবচেয়ে বড় কথা, মন খুলে আবেগ প্রকাশ করতে দেবে।

আমরা সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি না, সঠিক মানুষকে বেছে নিতে পারি না। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সঠিকভাবে করতে আমাদেরকে সাহায্য করে আমাদের বন্ধু। জীবনের বহু চড়াই-উতরাইয়ে বিভিন্ন পরামর্শ, সঙ্গ দিয়ে তারা আমাদের জীবনীশক্তিটা বাঁচিয়ে রাখে। তাই আমাদের উচিত বন্ধুর প্রতি সব সময় কৃতজ্ঞ থাকা। এবং বন্ধু যখন আমাদেরকে বোঝায় আমরা তাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তখনও আমাদের উচিত তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।

‘বন্ধু’ এমন একটা শব্দ, যার সাথে জড়িয়ে আছে অনেক আবেগ, ভালোবাসা, ভরসা। বন্ধু সবার জীবনে খুবই অপরিহার্য একটা অংশ। শুধু মানুষ নয়, সমগ্র প্রাণীকূলের ক্ষেত্রেই। বন্ধু ছাড়া প্রাণীকূল টিকে থাকতে পারত না। আমাদের বাস্তুসংস্থানটাও যেন এক ধরনের বন্ধুত্ব। দেওয়া-নেওয়ার মেলবন্ধন। পুরো প্রাণীকূলই যখন বন্ধুত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ, তখন মানুষের বন্ধু ছাড়া বেঁচে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। আমরা কেউই দোষের ঊর্ধ্বে নই। গুণ যেমন প্রতিটা মানুষের আছে, তেমনই দোষও রয়েছে। বন্ধুরা সে সকল দোষ উপেক্ষা করে চলে। আমাদের দোষগুলোর কারণে তারা কখনও আমাদেরকে ছেড়ে যায় না, ক্ষেত্র বিশেষে হয়তো দোষ শোধরানোর চেষ্টা করে। বরং একই রকম উদারতা ও ভালোবাসার সাথে আমাদের দোষ এবং গুণ দুটোই তারা গ্রহণ করে। তারা কখনও অনুভব করায় না, আমাদের দোষ কত বেশি বা আমরা কতটা গুণহীন! তারা শুধুই ভালোবাসা বিনিময় করতে জানে।

একটু আগেই বলা হয়েছে, আমরা কেউ দোষের ঊর্ধ্বে নই। কিন্তু দোষ স্বীকার করতে অনেক সাহসের প্রয়োজন হয়। অনেক সাহসী মানুষও এই কাজটি করতে মাঝে মাঝে হিমশিম খেয়ে যায়। কিন্তু খুব দুর্বল চিত্তের একজন মানুষ অবলীলায় বন্ধুর সামনে নিজের দোষটা স্বীকার করে নিতে পারে। এই মানুষটার ক্ষেত্রেই আমাদের শুধু ভাবতে হয় না, “আমাকে ভুল বুঝবে না তো! আমাকে ছেড়ে যাবে না তো!” এটাই বন্ধুত্বের মহত্ব। অকারণ আড্ডা আর অর্থহীন হাসাহাসির কথা বলছি। প্রতিদিন খানিকটা সময় কোনো যুক্তি বা কাজের মাঝে না থেকে মন খুলে হেসে ওঠাটাও যেন পরেরদিনের প্রতিযোগিতাময় জীবনের ইন্ধন। বন্ধু আমাদের জীবনের সেই প্রদীপ, যে দুর্দিনেও টিমটিম করে আলো ছড়ায়। আপনার মন যতই খারাপ থাকুক না কেন; বন্ধুর সাথে ১০ মিনিট আড্ডা অচিরেই আপনার সকল সমস্যা, চিন্তা, অশান্তি, বিরক্তি অনেকটা হালকা করে দেবে। ১০ মিনিটেই ফিরে পাবেন পুরনো আপনাকে। ক্ষমাশীলতার মতো সুন্দর গুণটাও আমরা পাই বন্ধুর কাছ থেকে। আমরা জানি যে, মানুষ মাত্রই ভুল। কোনো মানুষই নিখুঁত বা নির্ভুল নয়। আমরা সবাই করি, কিন্তু বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার কাছে সেই ভুলগুলো নিছকই ফিকে পড়ে থাকে। অকারণে খারাপ ব্যবহার করলে, বন্ধু আমাদের উপর রাগ করে না। তারা বোঝে যে আমরা কোনো সমস্যায় আছি। তারা জানে, এই মুহূর্তে আমাদের তাদেরকে ভীষণভাবে দরকার। আমাদের খারাপ সময়ে আমাদের শত রাগ-ঝাল সহ্য করেও বাঁশের খুঁটির মতো আমাদের অবলম্বন হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকে যে, সে-ই তো বন্ধু।

বন্ধুর এমন মধুর আহবান উপেক্ষা করেছে কে কবে? পৃথিবীতে যত সম্পর্ক আছে তার মধ্যে সবচেয়ে মধুর, আবেগের এবং একইসাথে জটিল একটা সম্পর্ক হচ্ছে বন্ধুত্ব। এ হচ্ছে আত্মার শক্তিশালী বন্ধন যার সাথে জড়িয়ে আছে আবেগ,ভালোবাসা এবং ভরসা। বন্ধুহীন জীবন অনেকটা পালহীন নৌকার মতো।

বন্ধুত্ব গড়তে ধীরগতির হও। কিন্তু বন্ধুত্ব হয়ে গেলে প্রতিনিয়তই তার পরিচর্যা করো।

* স্যামুয়েল জনস্টন

আমার বন্ধুর জন্য সবচেয়ে বেশি যা করতে পারি তা হল শুধু বন্ধু হয়ে থাকা। তাকে দেয়ার মতো কোনো সম্পদ আমার নেই। সে যদি জানে যে আমি তাকে ভালোবেসেই সুখী, সে আর কোনো পুরস্কারই চাইবে না। এক্ষেত্রে বন্ধুত্ব কি স্বর্গীয় নয়?

* রবার্ট লুই স্টিভেন্স

কোভিড- ১৯ আমাদের জীবন থেকে এরই মধ্যে অনেকগুলো উৎসব কেড়ে নিয়েছে। বৈশাখ কেঁটেছে রঙহীন, ঈদ তেমনি ছন্দহীন। ঘরবন্দী জীবনে ঈদের আনন্দ কিছুটা হলেও বন্ধুদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে অনলাইনে ব্যাতিক্রম এক আড্ডা আয়োজন করে ‘ক্লাব ৯৪’। ঈদের দিন থেকে শুরু করে টানা পাঁচদিন সন্ধ্যা ৭ টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ২ টা পর্যন্ত গানে কবিতায় মাতিয়ে রেখেছে দেশ বিদেশের সকল ৯৪ এর বন্ধুদের। ক্লাবের বিভিন্ন বন্ধুদের সাথে যোগ দিয়েছেন এ ক্লাবেরই অন্যতম সদস্য নির্মাতা অনিমেষ আইচ, অভিনেত্রী দীপা খন্দকার সহ আরো অনেকেই।

চলার পথে বন্ধুর প্রয়োজন হয়। এ কারণে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হবে এবং কাদের বর্জন করতে হবে এ ব্যাপারে রয়েছে আল্লাহতায়ালার বিশেষ নির্দেশনা। পবিত্র কোরআনে কারিমে ইরশাদ হচ্ছে, ‘আর ঈমানদার পুরুষ এবং ঈমানদার একে অপরের বন্ধু। তারা ভালো কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। নামাজ প্রতিষ্ঠিত করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন-যাপন করে। তাদের ওপর আল্লাহতায়ালা অনুগ্রহ করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী সুকৌশলী। -সূরা আত তওবা: ৭১
যেহেতু আমরা বন্ধু ছাড়া চলতে পারি না; সেহেতু বন্ধু গ্রহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে।

তাই কখনই প্রিয় বন্ধুকে জানাতে কার্পণ্য করবেন না, তাকে আপনি কতটা ভালোবাসেন। বন্ধুত্ব উদযাপন করুন, প্রতিদিন, প্রতিটা সময়।

লেখক-কাজী ফিরোজ আহাম্মদ।
শিক্ষার্থী- সিএসই বিভাগ।
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %