সাভারে পুলিশের অভিযানের সময় পাঁচতলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে ছাত্রদল নেতা নিহত, তদন্ত কমিটি গঠনস্টাফ রিপোর্টার | সাভারঢাকার সাভারের বাংলাদেশ পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং সেন্টার (বিপিএটিসি) এলাকায় পুলিশের একটি অভিযানের সময় পাঁচতলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে সাভার থানা ছাত্রদলের সহসভাপতি মনোয়ারুল হোসেন বকশী (২৯) নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) দিবাগত রাত প্রায় ১২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।নিহত মনোয়ারুল হোসেন বকশী বিপিএটিসির নৈশপ্রহরী জাফর মিয়ার ছেলে। তিনি পরিবারের সঙ্গে বিপিএটিসি এলাকার একটি পাঁচতলা ভবনের চতুর্থ তলায় বসবাস করতেন এবং সাভার থানা ছাত্রদলের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।

পুলিশ জানায়, মনোয়ারুলের ভাগনে শাহরিয়ার কবির সৌমিক প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে গত ২৩ জুলাই রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে মিম নামে এক কিশোরীকে নিয়ে সাভারে তার নানার বাসায় আসেন। এ ঘটনায় কিশোরীর পরিবার পীরগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। সেই জিডির সূত্র ধরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় কিশোরীর অবস্থান শনাক্ত করে বৃহস্পতিবার রাতে পীরগঞ্জ থানার এসআই কনক রঞ্জন বর্মণের নেতৃত্বে একটি দল সাভারে আসে। পরে সাভার মডেল থানা পুলিশের সহযোগিতায় বিপিএটিসি এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় সৌমিক ও ওই কিশোরীকে বাসায় পাওয়া যায়নি। একপর্যায়ে মনোয়ারুল ভবনের ছাদে উঠে যান। পরে তিনি ছাদ থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন। তাকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

তবে নিহতের পরিবারের দাবি, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে তাকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে হত্যা করা হয়েছে।নিহতের ভাই মমদেল অভিযোগ করেন, মূলত তার ভাগ্নেকে খোঁজার অজুহাতে পুলিশ তাদের বাসায় যায়। তিনি দাবি করেন, দুই ভাইকেই হত্যার উদ্দেশ্যে অভিযান চালানো হয়েছিল। তার ভাষ্য, “জিজ্ঞাসাবাদের নামে আমার ভাইকে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।” তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের দাবি জানান।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করা স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল মনি বলেন, বিকট শব্দ শুনে বাইরে এসে তিনি ভবনের ছাদে একজন পুলিশ সদস্যকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। নিচে মনোয়ারুলের নিথর দেহ পড়ে ছিল। কয়েক মিনিট পর ওই পুলিশ সদস্য ছাদ থেকে নেমে একটি মাইক্রোবাসে ওঠেন এবং পরে অন্য সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলে তার দাবি।ঢাকা জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক সুজন শিকদার দাবি করেন, মিমকে উদ্ধারের জন্য পুলিশ বাসায় প্রবেশ করলে মনোয়ারুল ছাদে চলে যান। এ সময় পুলিশও তার পিছু নেয়। এরপর তিনি ছাদ থেকে নিচে পড়ে যান।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পীরগঞ্জ থানার এসআই কনক রঞ্জন বর্মণ। তিনি বলেন, তারা বাসার ভেতরে মনোয়ারুলের বাবা জাফর মিয়া ও মায়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় নিচে বিকট শব্দ শুনে বাইরে এসে একজন যুবককে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে জাফর মিয়া জানান, তিনি তার ছেলে মনোয়ারুল।সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, পীরগঞ্জ থানার পুলিশের অভিযানে সহায়তার জন্য নিয়ম অনুযায়ী সাভার থানা থেকে পুলিশ সদস্য দেওয়া হয়েছিল। সাভার থানার সদস্যরা ভবনের নিচে অবস্থান করছিলেন। মনোয়ারুল কীভাবে ছাদ থেকে নিচে পড়ে গেলেন, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ঘটনার পর ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে মনোয়ারুলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।এদিকে ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযানের সময় ভবনের ছাদে কারা ছিলেন, মনোয়ারুল কীভাবে নিচে পড়ে গেলেন, অভিযোগ অনুযায়ী কোনো ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেছিল কি না এবং ঘটনার আগে-পরে কী ঘটেছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।উল্লেখ্য, পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি এবং ছাত্রদল নেতাদের বক্তব্যের পাশাপাশি পুলিশ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।