এবার প্লট বরাদ্দে জালিয়াতির অভিযোগে দুদকের করা পৃথক তিন মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২১ বছরের কারাদণ্ড ও তিন লাখ টাকা জরিমানা করেছেন আদালত। একই সঙ্গে পৃথক দুই মামলায় তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার বিশেষ জজ-৫-এর বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন এ রায় ঘোষণা করেন। পাশাপাশি তিন মামলায় আরো ১৯ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত করা হয়েছে।অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম সরকারকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

তবে রায়ে শেখ হাসিনাসহ অন্য আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন না হওয়ায় অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন দুদকের প্রসিকিউটর।

দণ্ডিত অন্যরা হলেন—প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব সালাউদ্দিন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, জাতীয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শহীদ উল্লাহ খন্দকার, অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) কাজী ওয়াছি উদ্দিন, সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা, সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, সাবেক মেজর (ইঞ্জিনিয়ার) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী (অব.),  রাজউকের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) কবির আল আসাদ, সাবেক সদস্য (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) মো. শফিউল হক, সাবেক সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) তন্ময় দাস, সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মো. নুরুল ইসলাম, সাবেক পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) শেখ শাহিনুল ইসলাম, সাবেক পরিচালক মো. কামরুল ইসলাম, সাবেক উপপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান, সাবেক সহকারী পরিচালক হাবিবুর রহমান, সাবেক সহকারী পরিচালক নায়েব আলী শরীফ, সাবেক সহকারী পরিচালক মাজহারুল ইসলাম ও সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। তাঁদের মধ্যে দুই মামলায় সালাহ উদ্দিনের ১২ বছর ও দুই লাখ টাকা জরিমানা, তিন মামলায় শরীফ, শাহিদ ও ওয়াসীর ১৮ বছর কারাদণ্ড ও তিন লাখ টাকা জরিমানা, আনিসুরের তিন মামলায় ১৫ বছর ও তিন লাখ টাকা জরিমানা, তিন মামলায় নাসির ও সামসুদ্দিনের ৯ বছর ও ৬০ হাজার টাকা জরিমানা, পূরবী গোলদারের তিন মামলায় তিন বছর ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা, দুই মামলায় তন্ময় ও নুরুলের ছয় বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ হাজার টাকা জরিমানা, এক মামলায় কবির, শাহিনুল, শফিউল ও কামরুলের তিন বছরের কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা, এক মামলায় হাফিজুর, হাবিবুর ও মাজহারুলের এক বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, তিন মামলায় খুরশীদের তিন বছরের কারাদণ্ড ও ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

এদিন কারাগারে আটক আসামি খুরশীদ আলমকে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আদালতে হাজির করা হয়। তাঁকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। রায় ঘোষণার আগে ১০টা ৫৫ মিনিটের দিকে এজলাসে তোলা হয়। ১১টা ২৩ মিনিটে বিচারক এজলাসে ওঠেন।তাঁর উপস্থিতিতে বিচারক রায় ঘোষণা করেন। রায় শেষে সাজা পরোয়ানা দিয়ে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সুলতান মাহমুদ বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম প্রত্যেক মামলায় শেখ হাসিনাসহ অন্য আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে। দুদক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আমরা এ রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যাব কি না সিদ্ধান্ত নিব। তবে দোষী প্রমাণিত হলেও সর্বোচ্চ সাজা না হওয়ায় আমরা এ রায়ে অখুশি হয়েছি।’

এর আগে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি শেখ হাসিনাসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক সালাহউদ্দিন। মামলাটি তদন্ত শেষে একই বছরের ১০ মার্চ তদন্তে প্রাপ্ত আরো চারজনসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া। পরে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি দুদকের সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া বাদী হয়ে পুতুলসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তদন্ত শেষে ১৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি সজীব ওয়াজেদ জয়সহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের সহকারী পরিচালক এস এম রাশেদুল হাসান। মামলাটি তদন্ত শেষে ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। গত ৩১ জুলাই তিন মামলায় অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। বিচার চলাকালে আসামি শেখ হাসিনাসহ ১২ জনের মামলায় ২৯ জন, সজীব ওয়াজেদ জয়সহ ১৭ জনের মামলায় ৩২ জন এবং সায়মা ওয়াজেদ পুতুলসহ ১৮ জনের মামলায় ৩০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। গত ১৭ নভেম্বর আত্মপক্ষ সমর্থনে কারাগারে আটক আসামি খুরশীদ আলম নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। অন্য আসামিরা পলাতক থাকায় নিজেদের নির্দোষ দাবি করতে পারেননি। পরে গত ২৩ নভেম্বর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য ২৭ নভেম্বর দিন ধার্য করা হয়। মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, সরকারের সর্বোচ্চ পদে থাকাকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর পরিবারের ওপর অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। তাঁরা বরাদ্দ পাওয়ার যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও অসৎ উদ্দেশ্যে পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরের ২০৩ নম্বর রাস্তার ছয়টি প্লট তাঁদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে অভিযোগ আনা হয়। এর আগে গত ২৬ ডিসেম্বর শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ছয়টি প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।

অনুসন্ধানে দুদক জানতে পারে, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরের কূটনৈতিক জোনের ২০৩ নম্বর সড়কের আশপাশের এলাকায় শেখ হাসিনা, তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, ছোট বোন শেখ রেহানা ও তাঁর ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকের নামে প্লটগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনা ১০ কাঠার প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন। ২০২২ সালের ৩ আগস্ট তাঁর নামে রাজউক প্লটের বরাদ্দপত্র দেয়। সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলও ১০ কাঠা করে প্লট পেয়েছেন। জয়ের বরাদ্দপত্র ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর দেওয়া হয় এবং ১০ নভেম্বর মালিকানাসংক্রান্ত রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়। পুতুলের বরাদ্দপত্র দেওয়া হয় ওই বছরের ২ নভেম্বর। শেখ রেহানাও ১০ কাঠার প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন। তাঁর ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক এবং মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকের নামেও একই পরিমাণের প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পরে চলতি বছরের গত ১২, ১৩ ও ১৪ জানুয়ারি তাঁদের বিরুদ্ধে পৃথক ছয়টি মামলা করে দুদক।